February 11, 2024
Book Review

আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য

আমি-সিরাজুল-আলম-খান

সিরাজুল আলম খানের সহচর শামসুদ্দিন পেয়ারা লিখেছেন জীবনীভিত্তিক এই গ্রন্থ ‘আমি সিরাজুল আলম খান’।

সিরাজুল আলম খান এদেশের রাজনীতির এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব। তিনি ২১ বছর বয়সে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হন। তারই এক সময়ের সহচর শামসুদ্দিন পেয়ারা লিখেছেন সিরাজুল আলম খানের জীবনীভিত্তিক এই গ্রন্থ ‘আমি সিরাজুল আলম খান’।

ষাটের দশকের রাজনীতি। সুনির্দিষ্ট করে বললে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ছাত্রলীগের ভেতরে থাকা সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ, আবদুর রাজ্জাক ও আ.স.ম আব্দুর রব’রা স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস গঠন করেছিল তারই বিস্তারিত বয়ান রয়েছে এই বইতে। লেখক শামসুদ্দিন পেয়ারা তার এই বইতে নিউক্লিয়াসের খুঁটিনাটির ওপর বেশি জোর দিয়েছেন।

আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য

সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সিরাজুল আলম খানের আলোচিত-সমালোচিত সিরাজুল আলম খান হয়ে উঠবার গল্পটি পাঠক এই বইতে পাবেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কতিপয় ঘটনাকে একসঙ্গে মেলাতে পারলে হয়তো ষাটের দশকের উত্তাল সময়কে বুঝতে সুবিধা হবে।

নিউক্লিয়াস মূলত ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গঠিত একটি গোপন সংগঠন বা সেল। আস্তে আস্তে এটি দেশজুরে গোপনে কর্মী সংগ্রহ করতে থাকে। 1962 সাল থেকে শুরু করে 1966 এর 6দফা আন্দোলন এবং 1969 এর গণঅভ্যুত্থান সহ সকল আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনার নেপথ্যে ভূমিকা পালন করেছে এই “নিউক্লিয়াস”।

জাতীয় পতাকা তৈরি ও 2 মার্চ আ.স.ম আব্দুর রব কর্তৃক জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং স্বাধীনতার ইশতেহার, “জয় বাংলা”কে জাতীয় স্লোগানে রূপদ্বান এবং বিভিন্ন সময়ে হরতাল, মিটিং-মিছিল সহ তৎকালিন সময়ে জনপ্রিয় সব স্লোগান প্রণয়ন, ছাত্র আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিকদের সম্পৃক্তকরনসহ গুরুত্বপূর্ণ সব কর্মসূচির মূল পরিকল্পনাকারিও ছিলেন রাজনীতির এই রহস্য পুরুষ খ্যাত সিরাজুল আলম খান।

আমি-সিরাজুল-আলম-খান-শামসুদ্দিন-পেয়ারা

মুক্তিযুদ্ধের সময় নিউক্লিয়াস ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীবৃন্দ মুজিব বাহিনী গঠন করে চার সেক্টরে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করে।

বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেই নিউক্লিয়াসের এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন সিরাজুল আলম খান। শুরুতে বঙ্গবন্ধু নিউক্লিয়াসের অগ্রযাত্রা না জানলেও 1969 সালে সিরাজুল আলম খান বঙ্গবন্ধুকে তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে জানান। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু তাদের সকল আন্দোলন সংগ্রামে সমর্থন দিয়ে আসছিলেন।

সিরাজুল আলম খান বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে স্নেহধন্য প্রভাবশালী ছাত্রনেতা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকার বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম রূপকার।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে “বিপ্লবী জাতীয় সরকার” গঠন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে মতভেদ দেখা দিলে তিনি পৃথক রাজনৈতিক দল জাসদ গঠন করেন। দ্রুত জাসদ জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে এবং সিরাজুল আলম খান তার তত্ত্ব নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্ভুদ্ধ করতে সক্ষম হন।

1972 সালের 31 অক্টোবর প্রতিষ্ঠার পর থেকে 1975 এর 7 নভেম্বরে সিপাহী জনতার অভ্যূত্থানের সময়কাল পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার মাঝেও জাসদ জাতীয় রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও পরবর্তীতে দায়িত্বরত রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অদূরদর্শীতার কারনে দলটি ক্ষমতার খুব কাছে গিয়েও ক্ষমতার স্বাদ নিতে ব্যর্থ হয়। বরং জাসদের প্রায় দশ হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। সামরিক আদালতে কর্ণেল তাহের এর ফাঁসি কার্যকর ও মূল নেতৃত্ব দীর্ঘ দিন কারাগারে থাকায় জাসদের সক্রিয়তা স্থিমিত হতে থাকে।

লাল সন্ত্রাস : সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি

সিরাজুল আলম খান ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন-সংগ্রাম ও স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণের অন্যতম নিয়ামক শক্তি। তিনি যেভাবে চেয়েছেন, যা করতে চেয়েছেন, তাই করেননি—করিয়েছেন।

দেশের অধিকাংশ মানুষই তাকে কোনোদিন দেখেননি, কিন্তু তার গল্প শুনেছেন। গল্পে তার প্রতি মোহ তৈরি হতো। তরুণরা সেই মোহে আকৃষ্ট হতেন। গল্পে কখনো তিনি কপালকুণ্ডলার ‘কাপালিক’, কখনো রাজনীতির ‘দাদা ভাই’। জাসদ নেতা আ স ম রবের ভাষায় ‘তিনি আমাদের নেতার নেতা, মহান নেতা, তাত্ত্বিক নেতা’। রহস্যময় জীবনযাপন তাকে রহস্য মানবে পরিণত করেছে। যতটা তাকে জানা যায়, অজানা থাকে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি।

এই বইয়ে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পেয়ারা সাহেব যা লিখেছেন তার কতটা সিরাজুল আলম খান বলেছেন আর কতখানি পেয়ারা সাহেবের অবদান তা নিরূপণ করতে না পারা। দ্বিতীয়ত, সিরাজুল আলম খান সবসময় সেফ সাইডে থাকতে চেয়েছেন। ইতিহাসের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো তিনি স্পষ্ট করেননি।

অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা – মেজর জলিল

goodreads

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x