February 25, 2024
Blog

অমর একুশে বইমেলা ২০২৩

অমর একুশে বইমেলা ২০২৩-এম এইচ মাসুদ

অমর একুশে বইমেলা ২০২৩। যারা ভালোবাসে, তারা বইমেলায় যায়।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ব্যাপকভাবে পরিচিত একুশে বইমেলা। স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর অন্যতম। প্রতি বছর পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে এই মেলা বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাংলা একাডেমির মুখোমুখি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

নামকরন

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের যে বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই এই মাসে আয়োজিত এই বইমেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।

একুশে বইমেলা

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব দিকের গেইট দিয়ে বই মেলায় ঢুকতে গিয়ে দেখলাম দীর্ঘ লাইন। লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়ালাম। লাইন আস্তে আস্তে এগিয়ে চলছে। বিকাল 3:30 মিনিটে মেলায় ঢোকার সাথে সাথে মার্জিত কণ্ঠে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে; আপনারা যারা বই কিনেছেন বা প্রয়োজনীয় কর্ম সম্পন্ন করেছেন তারা বইমেলা ত্যাগ করুন কারন প্রতি মুহুর্তে দর্শনার্থী তীব্রতর বেড়ে চলেছে। ইতোমধ্যে তিল ধারণের জায়গা নেই।

লোকারণ্যে হতোদ্যম হলেও পরক্ষনেই মনটা আরামবোধ করলো। আজ ২১শে ফেব্রুয়ারী একইসাথে শোকের ও গৌরবের। এ দিন উপলক্ষে সাদা-কালো সাজে ছোট-বড়, তরুণ-তরুণীসহ সকল বয়সের মানুষ শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছেন বইমেলায়। বেলা বাড়ার সাথে সাদা-কালো সাজের ভিড় ছড়িয়ে পড়ে পুরো একুশে বইমেলায়। এদিন দর্শনার্থী বেশি হলেও ক্রেতার সংখ্যাও অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি মনে হলো। কারণ স্টলে স্টলে উপচে পড়া ভিড়। সবাই প্রাণবন্ত বই কিনছে। বই নিয়ে ছবি তুলছে।

মানুষ পায়ে পায়ে চলছে বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলে বই নাড়াচাড়া করছে। সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নিচ্ছে ভিডিও করছে। সু-পরিচিত অপরিচিত লেখক-পাঠকদের আনাগোনা টের পাচ্ছি। কার যেন কোন কিছুতে খেয়াল নেই। প্রতিটি স্টলে ভিড়; অপেক্ষা করে করে কাঙ্খিত বইটি খুঁজতে হচ্ছে। প্রাণবন্ত ও ছুটোছুটি স্বভাবের একটা মেয়েকে দেখলাম তার সঙ্গীনীদের ডাকছে এই তোরা এদিকে আয় ঐখানে একটা সুন্দর প্রকাশনী দেখা যাচ্ছে। ঐখান থেকে বই কিনবো। একজনকে লক্ষ্য করলাম বই নাড়াচাড়া করে বিক্রয়কর্মীকে জিজ্ঞাসা করলো এই বইটি ভালো হবে, সে বললো হ্যাঁ ভালো হবে। তখন ক্রেতা বইটি কিনে নিল। স্টলে এক কিশোরকে লক্ষ্য করলাম কি বই কিনবে ভেবে পাচ্ছে না, জাফর ইকবাল এর “আমি তপু” বইটি কেনার পরামর্শ দিলাম তাকে, সে কিনলো। যে যেভাবে পারছে বই কিনছে।

মেলায় এতক্ষনে ঘন্টাখানেক এ স্টলে ও প্রকাশনীতে ঘুরেও লেখক আশীফ এন্তাজ রবি’র “কেবলই রাত হয়ে যায়” বইটি খুজেঁ পাইনি। আমি জানতাম বইটি ঝিনুক প্রকাশনীতে পাওয়া যাবে। সেখানে গিয়ে জানলাম তা ছিল ভুল তথ্য। তথ্য কেন্দ্রে গেলাম সেখানেও কোন হদিস পেলাম না। একটি স্টলে গিয়ে সাদা-কালো সাজের দুইজন সজ্জন মেয়ে বিক্রয়কর্মীকে বইটির ব্যাপারে বললাম, তারা কিছু না ভেবেই বললো আমরা জানিনা আপনি স্টলের নম্বর বলুন দেখিয়ে দেবো। আরেক স্টলে গিয়ে খুঁজলাম তারাও সন্ধান দিতে পারে নাই। আমার ফোনে চার্জ থাকলে এ ভোগান্তিতে নিশ্চয়ই পড়তে হতো না। বইটি নিমিষেই পেয়ে যেতে পারতাম।

তবুও বইটি অব্যাহত খুঁজতে থাকলাম আর একুশে বইমেলার সৌন্দর্য উপভোগ করতেছিলাম। প্রচণ্ড ভিড়ে একবার ভাবি মেলা থেকে বের হয়ে যাই, অন্যদিন আসবো। আবার ভাবি আরেকটু চেষ্টা করি; মেলা থেকে কাঙ্খিত বইটি খুঁজে বেড় করাও স্বার্থকতা। এতে মেলায় ঘোরাটা যথার্থ হবে। এভাবে আমি আর মানিক নিজেদেরকে বোঝাই। বইটি না পেলে নয়তো রকমারী থেকে কিনে নিবো।

বইমেলায় গিয়ে বই কিনতে হবে এমনতো কোন বাধ্য-বাধকতা নেই। এটাতো শুধু বইমেলা নয়- এটা প্রাণের মেলা। লেখক–পাঠকের মিলনকেন্দ্রে। এ মেলায় লেখক ও পাঠকের যোগাযোগের সৃষ্টি হয়। লেখকদের বিচিত্র মনোমুগ্ধকর বইয়ের নাম চোখে পড়ে । বইয়ের সৃজনশীল প্রচ্ছদ দেখা যায়। এবারও ধ্রুব এষ দা’র কয়েকটি নতুন প্রচ্ছদ মন কেড়েছে। প্রকাশনী ও তাদের সাজানো মনোরম স্টল দেখার মতো। পুথিঁনিলয় প্রকাশনীর একটি স্টল পরিদর্শন করলাম; চারদিক ঘোরানো বৃত্তাকার, একবার পাক খেলে তাদের প্রকাশিত সকল বই দেখতে পাওয়া যায়। কোনো কোনো প্রকাশনী ছন-চাঁচ দিয়ে কুড়েঁঘর করে তাদের স্টল বানিয়েছে। শীতল মনোরম পরিবেশ ভিড় থাকলে কোথাও হট্টগোল নেই। এ মেলা পাঠক-পাঠিকার মিলনকেন্দ্র।

মেলায় কোনো কোনো জায়গা বেজায় ভীড় দেখা যায়; যেখানে লেখক তার পাঠককে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন সেলফি তুলছেন। কোলকাতা থেকে আগত দর্শনার্থীরাও সানন্দে বই কিনছে সেলফি তুলছে। আমার কাঙ্খিত বইটি তখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদিও এতে আমি বিচলিত ছিলাম না। কারন এ উপলক্ষে আরেকবার এই প্রাণের মেলায় তাম্রলিপি প্রকাশনী থেকে আশীফ এন্তাজ রবি’র “কেবলই রাত হয়ে যায়” বইটি সংগ্রহ করবো (যখন লিখছি ততক্ষনে বইটির প্রকাশনীর তথ্য জেনে গেছি)। বইটি পড়ে একখানা রিভিউ লিখবো ইচ্ছা আছে। গত এক শুক্রবারও সন্তানকে নিয়ে সস্ত্রীক একুশে বইমেলায় গিয়েছিলাম। “কেবলই রাত হয়ে যায়” এবং মনদীপ ঘরাই দা’র প্রথম প্রকাশিত বই “একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি” বই দু’টো সংগ্রহের জন্য আবারও প্রাণের মেলায় যাবো।

বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত অমর একুশে বক্তৃতা, লেখকদের কথা, কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি শোনার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে ঢু মারার সুযোগ হয়নি আজ। ২১শে ফেব্রুয়ারী আমাদের জীবনে কোন সাধারন দিন নয়; জাতির জীবনে এ দিবসটির মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একুশ আমাদের চেতনাকে জাগ্রত রাখে। আসুন বই পড়ি, প্রিয়জনকে বই উপহার দেই।

দেখুনঃ বাংলাদেশের 5টি বিখ্যাত নন-ফিকশন বই | সত্য কল্পকাহিনী থেকেও রোমাঞ্চকর।

একুশে বইমেলায় যাওয়ার আগে থেকে কিছু বিষয় জেনে নিনঃ
  • ছুটির দিনে মেলা শুরু হয় বেলা 11টায় আর অন্যান্য দিন শুরু হয় বিকাল 3:00টায়। চলে যথারিতি রাত 9টা পর্যন্ত।
  • বইয়ের নাম ও প্রকাশনীর নাম জেনে নোট রাখুন, পারলে স্টল নম্বরও জেনে রাখুন। কারণ প্রকাশকেরা নিজেদের বই ছাড়া অন্য প্রকাশনীর বই বিক্রি করতে পারেন না।

লেখক: এম এইচ মাসুদ