February 13, 2024
Book Review

পাঠকের মৃত্যু: বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)

পাঠকের মৃত্যু

পাঠকের মৃত্যু গল্পটা লেখক খুব সুন্দরভাবে একেবারেই সংক্ষিপ্তভাবে লিখেছেন, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় এর প্রত্যেকটা গল্পই সংক্ষিপ্ত।

পাঠকের মৃত্যু বইটির মতো লেখকের প্রতিটি গল্প একপাতা অর্ধেক পাতা বা দেড়পাতা এর উপরে নেই। যেটা আমরা পাঁচ মিনিটেও শেষ করতে পারি আবার পাঁচ থেকে দশ পনের মিনিটের মধ্যেও শেষ হয়ে যায়। তারমানে এই নয় যে ওনি কোন টুকরা অংশ লিখে রেখেছেন। এই ছোট্ট পরিসরে এই ছোট্ট গল্পের ভিতর ওনার সমস্ত ছোট গল্পের বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে।

পাঠকের মৃত্যু রিভিউ

পাঠকের মৃত্যু গল্পটা আসানসোল স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত প্যাসেঞ্জার, অনেক প্যাসেঞ্জারই ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। তার ভিতর এই গল্পের যে কথক তিনিও অপেক্ষা করছেন। তার পাশে আরেকজন প্যাসেঞ্জারের হাতে একটি উপন্যাসের বই দেখতে পেলেন, তার কাছ থেকেই কথক বইটি পড়ার জন্য চেয়ে নিয়েছেন এবং পড়তে শুরু করলেন।

যেহেতু এখনো ট্রেন আসতে প্রায় দুই ঘন্টা সময় লাগবে। এই সময়ের ভিতর তিনি বইটি পড়তে থাকবেন তার সময় কেটে যাবে। কথক এমনই বই পাগলা পড়ুয়া যে তিনি এই উপন্যাসের ভিতর ডুবে গেলেন এবং গোগ্রাসে গিলতে লাগলেন। বইয়ের যে মালিক তিনি প্রায় দুই ঘন্টা পর কথককে স্মরন করিয়ে দিলেন ট্রেন আসতে বেশি সময় লাগবে না এখনই চলে আসবে। বইয়ের মালিকের সাথে কথা বলার মতো সময় ছিল না।

তিনি আরো দ্রুত বইটি পড়তে শুরু করলেন কিভাবে দ্রুত শেষ করা যায়। প্রায় বাহ্য জ্ঞান শূন্য বাইরের কি হচ্ছে না হচ্ছে এর তিনি ধার ধারেন না। তিনি শুধু এটা পরিকল্পনা করলেন এই ট্রেনে যাবেন না , পরবর্তী ট্রেনে যাবেন ততক্ষনে তার বইটি শেষ হয়ে যাবে।

এ অবস্থা দেখে বইয়ের মালিক হতবাক হয়ে রইলেন , এ কেমন আশ্চর্য ব্যাপার যে একটা বই পেয়ে লোকটা এমন করছে। একটা পর্যায় বইয়ের শেষের দিকে গিয়ে দেখলেন কতগুলো পৃষ্ঠা নেই। তাতে পাঠক ভিষন রেগে গেলেন এবং তার ভিতর যে এত কষ্ট তার যে তিক্ততা তিনি প্রকাশ করতে লাগলেন, তিনি বইয়ের মালিককে ধমকান কেন এরকম হলো। যাইহোক ঐ সময়টা ভিষন খারাপ লাগলো তিনি বইয়ের মালিককে তার বই ফেরত দিয়ে দিল। তিনি ট্রেন ধরে চলে আসছেন।

প্রায় দশ বছর পর কথক তার ভাগ্নির শশুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছেন। তারাও ভিষন যত্ন-আত্মি করেছেন। দুপুর বেলা খাওয়া শেষে একটা ঘরে বিশ্রামের জন্য শুতে দিয়েছেন। তিনি শুতে গিয়ে দেখেন আলমারীতে অনেকগুলো বই। সে বইয়ের ভিতর যে বইটা আসানসোল স্টেশনে অপূর্ণ রেখেছিলেন। সে বইটা দেখতে পেলেন এবং বইটি নিয়ে দ্রুত টেবিলে বসে পড়লেন। কিছুতেই এই বইয়ের ভিতর মন বসছিল না ভালে লাগেনি পড়তে এবং শেষের দিকের পৃষ্ঠাগুলো ছিল তাতেও তার মন ভরে নি। কিছুতেই তিনি মনোনিবেশ করতে পারল না।

অনেকক্ষন পর্যন্ত বইটা নাড়াচাড়া করলেন বিরক্তি প্রকাশ করে বইটি রেখে দিলেন। তিনি শুয়ে শুয়ে চিন্তা করলেন এমনটি কেন হলো। যে বইয়ের জন্য এক সময়ে তিনি ভিষন পাগল ছিলেন, রাস্তার লোক প্যাসেঞ্জারেরা তার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়েছিল এবং মনে মনে কত কিছুই না ভেবেছে। অথচ আজ তিনি বইটি একদম কাছে পেয়ে সেই আগ্রহ হারিয়েছে।

এতে কি বোঝা যায়, পাঠকের মৃত্যু হয়েছে। পাঠকের পড়ার সেই আগ্রহ সময়ের পরিবর্তনে শেষ হয়েছে। আসলে পৃথিবীর সকল কিছুই চলমান আরো বেশি চলমান মানব মন। এই পরিবর্তন বা চলমানতা সময় সাপেক্ষ এবং পরিবেশ সাপেক্ষ।

আর এ কারণেই একদিন পাঠক যে বইটি অতি আগ্রহ নিয়ে পড়েছিল বইটি শেষ করতে না পারায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। আজ দশ বছর পর সে বইটি কাছে পেয়ে পড়াটা তার কাছে অর্থহীন মনে হয়। মূলত চলমান পৃথিবী এবং সময়ের সাথে বদলে যায় মানব মন। এই মনস্ত্বাত্বিক বিষয়টি পাঠকের মৃত্যু বিষয় উঠে এসেছে।

পাঠকের মৃত্যু

জীবন ঘষে আগুন – হাসান আজিজুল হক

পাঠকের মৃত্যু গল্প’টি হুবহু দেওয়া হলোঃ

এক_ প্রায় দশ বৎসর আগেকার কথা। আসানসোল স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসিয়াছিলাম। ঠিক আমার পাশেই আর একজন বসিয়াছিলেন। হার হাতে একখানি বই ছিল। বেশ মোটা কখানি উপন্যাস। আলাপ-পরিচয় হইলে জানিতে রিলাম যে ভদ্রলোককে ট্রেনের জন্য সমস্ত দিন অপেক্ষা করিতে হইবে। আমার ট্রেনের সময় ঘন্টা- তিনেক দেরি ছিল। আমরা উভয়েই বাঙালি। সুতরাং পাঁচ মিনিট পরেই তাঁহাকে যে প্রশ্নটি আমি করিলাম তাহা এই- “আপনার বইখানা একবার দেখতে পারি কি?” “হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখুন না” । এই উত্তরই স্বাভাবিক এবং আশাও করিলাম।

অবিলম্বে বইখানা দখল করিয়া সিলাম। দু:সহ গ্রীষ্মের দারুণ দ্বিপ্রহর। আসানসোল স্টেশনের টিনের ছাদ। সমস্ত কিছু তলাইয়া গেল।উপন্যাস অদ্ভুত। বহির মালিক ভদ্রলোক আড়-নয়নে একবার আমার পানে চাহিয়া একটু ভুরু কুঞ্চিত করিলেন এবং একটি টাইম-টেবিল বাহির করিয়া তাহাতেই মনোনিবেশ করিলেন। আমি রুদ্ধশ্বাসে পড়িয়া চলিলাম। চমৎকার বই।

বস্তুুত এমন ভালো উপন্যাস আমি ইতোপূর্বে পড়ি নাই। একেবারে যেন জুড়াইয়া দিতেছে। দুই ঘন্টা কাটিল। বহির মালিক ভদ্রলোক টাইম টেবিলটি বারংবার উল্টাইয়া অবশেষে আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন- “আপনার ট্রেনের তো আর বেশি দেরি নেই। এইবার” বলিয়া একটু গলা খাঁকারি দিলেন। আমি তখন তন্ময় । চকিতে একবার হাত ঘঁড়িটার পানে চাহিয়া দেখিলাম। এখনও ন্টাখানেক সময় বাকি আছে। বই কিন্তু অর্ধেকের উপর বাকি। বাক্যব্যয় করিয়া সময় নষ্ট করিলাম না। গোগ্রাসে গিলিতে লাগিলাম। অদ্ভুত বই।

বাকি ঘন্টাটা যেন উড়িয়া গেল। আমার ট্রেনের ঘন্টা পড়িল। বই এর তখনও অনেক বাকি।
রোখ চড়িয়া গিয়াছিল। বলিলাম “নেকস্ট ট্রেনে যাব__ এ বই শেষ না করে উঠছি না!” বহির মালিক ভদ্রলোক একটু একটু কাশিয়া নির্বাক হইয়া রহিলেন। ট্রেন চলিয়া গেলবই পড়িতে লাগিলাম। শেষ কিন্তু করিতে পারি নাই। শেষের দিকে অনেকগুলি পাতা ছিল না। বহির মালিককে বলিলাম- “এহ, শেষের দিকে এতগুলো পাতা নেই। আগে বলেননি কেন? ছি ছি” এতদুত্তরে ভদ্রলোক কেবল নিষ্পলকনেত্রে আমার দিকে চাহিয়া রহিলেন। দেখিলাম তাঁহার রগের শিরাগুলি স্ফীত হইয়া উঠিয়াছে।

দুই
দশ বৎসর পর উক্ত পুস্তকখানি আর একবার আমার হস্তগত হইয়াছিল। আমার ভাগিনেয়ীর শ্বশুরায়লে। তাহাকে পৌঁছাইতে গিয়াছিলাম। সেইদিনই ফিরিয়া আসার কথা। কিন্তু বইখানির লোভে থাকিয়া গেলাম। সুযোগমত বইখানি সংগ্রহ করিয়া আবার সাগ্রহে পড়া শুরু করা গেল। খাপছাড়াভাবে শেষটুকু না পড়িয়া গোড়া হইতেই জমাইয়া পড়িব ঠিক করিলাম।

কয়েক পাতা পড়িয়াই কেমন যেন খটকা লাগিল। উল্টাইয়া দেখিলাম হ্যা, সেই বই ই তো!
আবার কয়েক পাতা অগ্রসর হইলামনাহ, কেমন যেন গোলমাল ঠেকিতেছে। তবু পড়িতে লাগিলাম। কিছুক্ষণ পরে মনে হইল নাহ, আর তো চলে না। এ কি সেই বই যাহা আমি সানসোল স্টেশনে দারুণ গ্রীষ্মের দ্বিপ্রহরে ঊর্ধ্বশ্বাসে তন্ময় হইয়া পড়িয়াছিলাম? এমন রাবিশ মানুষে লেখে! এ শেষ করা তো অসম্ভব!
দশ বৎসর আগেকার সেই উৎসুক পাঠক কবে মারা গিয়াছিল টেরও পাই নাই। এবারও বই শেষ হইল না।

পাঠকের মৃত্যু

Source: Goodreads

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x